নিজস্ব সংবাদদাতা : – ষোলো বছর আগের সেই অভিশপ্ত দিনের রক্তাক্ত দলিল হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে দেওয়ালের গায়ে গেঁথে থাকা বুলেটের ক্ষতগুলো। কয়েক ঘণ্টার এক ভয়াবহ লড়াই আর তার পর ২৪ জন বীর জওয়ানের ছিন্নভিন্ন দেহ—পশ্চিম মেদিনীপুরের সেই স্মৃতি আজও জঙ্গলমহলের মানুষের মনে শিহরণ জাগায়। ২০১০ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি শিলদা ইএফআর ক্যাম্পে যে নৃশংস মাওবাদী হামলা চলেছিল, আজ তার ১৬ বছর পূর্ণ হলো। সেই স্মৃতিকে সম্বল করেই রবিবার ঝাড়গ্রাম জেলা পুলিশের উদ্যোগে বিনপুর থানার শিলদা পুলিশ ক্যাম্পে মহাসমারোহে পালিত হলো শহিদ দিবস। এই বিশেষ দিনে রাজ্য পুলিশের ডিরেক্টর জেনারেল (ডিজি) পীযূষ পাণ্ডে স্পষ্ট বার্তা দিয়ে জানান যে, সেই ভয়াবহ দিন যাতে কোনোদিন আর ফিরে না আসে, সেজন্য পুলিশ ও সাধারণ মানুষকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে হবে। এর পাশাপাশি আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্যের সাধারণ মানুষ যাতে সম্পূর্ণ নির্ভয়ে এবং অবাধে তাঁদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, পুলিশ প্রশাসন তা নিশ্চিত করবে বলেও তিনি আশ্বস্ত করেন।

এদিনের অনুষ্ঠানে ২৪ জন শহিদ ইএফআর জওয়ানের পরিবারের সদস্যদের যথাযোগ্য মর্যাদায় সম্মান জানানো হয় এবং তাঁদের হাতে উপহার তুলে দেওয়া হয়। পুলিশ পরিচালিত দিশা কোচিং সেন্টারের পড়ুয়ারাও এদিন উপহার পায়। শহিদ জওয়ানদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে তৈরি বাগান এবং তাঁদের ছবি সম্বলিত শহিদ মিনার প্রাঙ্গণটি যেন এক শান্ত পরিবেশে পুরাতন অশান্ত জঙ্গলমহলের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল। রাজ্য পুলিশের ডিজি পীযূষ পাণ্ডে, জেলা শাসক আকাঙ্খা ভাস্কর এবং অন্যান্য উচ্চপদস্থ পুলিশ আধিকারিকরা গাছে জল দিয়ে এবং শহিদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। মাওবাদী সন্ত্রাস পর্বের সেই কঠিন দিনগুলোতে শিলদা-বাঁকুড়া রাজ্য সড়কের ধারে অত্যন্ত জনবহুল নিমতলা চকের কাছে একটি প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র প্রাঙ্গণে ইএফআর ক্যাম্পটি অবস্থিত ছিল। সেই বিকেলে মাওবাদীরা অতর্কিত হামলা চালালে জওয়ানরা পাল্টা প্রতিরোধ গড়েছিলেন, যাতে ৫ জন মাওবাদী নিহত হলেও তাদের সঙ্গীরা দেহগুলো নিয়ে পালিয়ে যায়। সেই নাশকতার পর ক্যাম্পটি সেখান থেকে সরিয়ে নিয়ে দূরে স্ট্র্যাকো জওয়ানদের জন্য নতুন ক্যাম্প তৈরি করা হয়।

শহিদ পরিবারের সদস্যদের জন্য এই দিনটি অত্যন্ত আবেগঘন ছিল। শহিদ ইএফআর জওয়ান প্রেম শেরিং লেপচার ছেলে লিটন লেপচা, যিনি ২০২৪ সালে পুলিশে চাকরি পেয়েছেন, তিনি এদিন তাঁর বাবার কথা বলতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। লিটন জানান, বাবার সেই মর্মান্তিক মৃত্যু আজও তাঁর মনে কাঁটার মতো বিঁধে আছে, তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র বারো বছর। তবুও প্রতি বছর এই দিনটিতে জেলা পুলিশ যেভাবে তাঁদের পাশে দাঁড়ায় এবং শহিদদের সম্মান জানায়, তার জন্য তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। এদিনের এই মহতী অনুষ্ঠানে জেলা শাসক আকাঙ্খা ভাস্কর ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন ঝাড়গ্রামের পুলিশ সুপার মানব সিংলা, মেদিনীপুর রেঞ্জের ডিআইজি অরিজিৎ সিনহা এবং রাজ্য পুলিশের বিভিন্ন স্তরের আধিকারিকরা। অতীতের সেই ভয়ংকর অভিজ্ঞতার স্মৃতি রোমন্থন করে বর্তমান জঙ্গলমহলকে আরও সুরক্ষিত রাখার অঙ্গীকারই ছিল আজকের এই অনুষ্ঠানের মূল সুর।
